যবের ছাতুর অসাধারণ গুণাগুণ

যবের ছাতুর অসাধারণ গুণাগুণ
ছাতু আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক পরিচিত একটি খাবার। এ খাবারের উৎপত্তি যব থেকে।যার বৈজ্ঞানিক নান 'Hordeum vulgare'. এটি অতি প্রাচীন কাল থেকেই আমাদের খাদ্যতালিকায় স্থান লাভ করেছে। আজকাল আধুনিক যুগে অনেকেই এই খাবারটি ভুলতে বসলেও এর স্বাস্থ্যগত উপকারীতা কিন্তু অনেক। যব দিয়ে শিশুখাদ্য, ওভালটিন,হরলিক্স সহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়। স্কটল্যান্ড ও আফ্রিকায় এর ব্যাপক চাষ ও ব্যবহার হয়।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে আমাদের শরীরের সার্বিক উন্নতিতে ছাতু অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে । শুধু তাই নয়, গরমের সময় শরীরকে ঠান্ডা রাখতে এবং হিট স্ট্রোকের মত সমস্যাকে দূরে রাখতেও ছাতু অনেক উপকারী । সেই কারণেই গরমের সময় ছাতুর চাহিদা বেশ বেড়ে যায়। ছাতুতে থাকা একাধিক খনিজ,ভিটামিন, উপকারি ফ্যাট এবং ফাইবার নানা ভাবে আমাদের শরীরের উপকারে লাগে । আসুন তবে জেনে নিই ছাতুর উপকারীতা সমূহ।

১. এনার্জি বাড়ায়ঃ ছাতুতে রয়েছে ভিটামিন, ফাইবার ও নানা রকম খনিজ উপাদান যা খাওয়ার সাথে সাথেই আমাদের রক্তে মিশে যায়। এর ফলে আমাদের শরীরে খুব দ্রুত এনার্জির মাত্রা বেড়ে যায়। এর ফাইবার আমাদের পেটকে রাখে ভরপুর। একই সাথে আমাদের শরীরের ভেতরে ভিটামিন এবং খনিজের ঘাটতি পূরণ হওয়ার কারণে সার্বিক ভাবে শরীর এবং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে । তাই তো প্রতিদিন সকালে ছাতু খুবই উৎকৃষ্ট একটি খাবার।

২. ওজন কমায়ঃ অন্যান্য খাবারে শর্করা থাকলেও ছাতুতে রয়েছে ফাইবার এবং উপকারী ফ্যাট। যা আমাদের ওজন বাড়তে দেয় না। ছাতুতে ফাইবার থাকার কারণে অল্প খেলেই আমাদের পেট ভরে যায়। তাই আমাদের খাবারের রুচি কমায় এবং অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ থেকে আমাদের বিরত রাখে। সেই সাথে অনেক লম্বা সময় ধরে আমাদের পেটকে ভরপুর রাখে তাই বার বার ক্ষিধে লাগে না। তাই যারা অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চিন্তায় আছেন তাদের জন্য ছাতু অনেক উপকারী একটি খবার।

৩. পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা বাড়ায়ঃ আমাদের প্রত্যাহিক খাবারের তেল এবং মসলা সমূহ আমাদের পাকস্থলীর স্বাস্থ্য অনেক খারাপ করে দেয়। প্রতিদিন খাবারের সঙ্গে যে পরিমাণ তেল আমাদের শরীরে প্রবেশ করে, তা পাকস্থলী থেকে বের করে দিতে ছাতু অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এর ফলে আমাদের পাকস্থলীর কর্মক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। ছাতুতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকার কারণে এটি নিয়মিত খেলে কনস্টিপেশনের মত সমস্যার প্রকোপ অনেক কমতে যায়। সেই সাথে হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটে

৪. ডায়াবেটিকের উপকারীঃ ছাতুতে গ্লাইসেমি কইনডেক্স কম হওয়ায় এতে থাকা শর্করা খুব আস্তে আস্তে রক্তে মিশে যেতে থাকে । তাই এই ধরনের খাবার খেলে হঠাৎ করে শরীরে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কাই থাকে না । এ জন্যই ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অনেক উপকারী একটি খাবার। বিশেষ করে, একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে নিয়মিত ছাতু খেলে আমাদের রক্ত চাপ অনেক কমে যায় । তাই যারা হাই ব্লাড প্রেসারে ভুগছেন তাদের জন্য অনেক উৎকৃষ্ট খাবার ।

৫. মেয়েদের পুষ্টিসমস্যা মেটায়: মেয়েদের পিরিয়ডের সময় শরীর অনেক দূর্বল হয়ে যায়। এ সময় তাদের শরীরে পুষ্টি জনিত সমস্যা দেখা দেয়। আর এই পুষ্টির ঘাটতি দূর করতে ছাতুর অনেক উপকারী একটি খাবার। এতে থাকা প্রচুর খনিজ এবং ভিটামিন উপাদান শরীরের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে থাকে।

৬. বাচ্চাদের শারীরিক বৃদ্ধিঃ বাচ্চাদের শরীরের সঠিক বৃদ্ধির জন্য় যে উপাদান গুলোর প্রয়োজন তা সবই রয়েছে ছাতুতে। বর্তমানে বাজারে বাচ্চাদের জন্য অনেক হেলথ ড্রিঙ্ক রয়েছে। কিন্তু এগুলো কতটুকু স্বাস্থ্যসম্মত তা নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে। তাই এসব হেলথ ডিঙ্কের পরিবর্তে ছাতু কিন্তু বাচ্চাদের অনেক ভালো একটি খাবার। ছাতু খাওয়ানো যায় , তাহলে দারুন উপকালে লাগে । বিশেষ করে ছাতু থাকা ক্যালসিয়াম, ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং অয়রন বাচ্চাদের হাড় এবং দাঁতের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে ।এর পাশাপাশি বাচ্চাদের রক্ত সল্পতা দূর করে এই খাবারটি।

৭. ত্বক এবং চুলের জন্য উপকারীঃ ছাতুতে থাকা প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আমাদের ত্বক এবং এবং চুলের জন্য অনেক উপকারী। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এক দিকে শরীরে থাকা ক্ষতিকারক টক্সিক উপাদান নিঃস্বরণ করে ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করে। আর প্রোটিন আমাদের শরীরের ভেতরে প্রোটিনের ঘাটতি পূরণ করে ।এর ফলে আমাদের ত্বক এবং চুলের জেল্লা বৃদ্ধি করে। তাই আমাদের ত্বকের এবং চুলের জন্য ছাতু কিন্তু বেশ উপকারী।

৮. বয়স্কদের জন্য আদর্শ খাবারঃ বয়স্ক ব্যাক্তিদের খাবারের ব্যাপারে বেশ সতর্ক থাকতে হয়। কারণ এ বয়সে তাদের হজম শক্তি অনেক কমে যায়। আর এ সময় নানা শারীরিক সমস্যা বাসা বাঁধে। এক্ষেত্রে কিন্তু ছাতু বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কারণ একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে ৬০ বছরের পর থেকে যদি নিয়মিত ছাতু খাওয়া যায় তাহলে একাধিক বয়সকালীন রোগ শরীরে বাসা বাঁধার কোন ও সুযোগই পায় না । ফলে শেষ বয়সটা বেজায় নিশ্চিন্তেই কেটে যায়।

উন্নতমানের পানীয় তৈরিতে যবের দানা প্রধান উপাদান। একসময় নাস্তাতে ও মেহমানদারিতে মুড়ির মতো ছাতুও ছিল লোভনীয় ও জনপ্রিয় খাবার। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে যবের চাষ বেশি হয়।

No comments:

Post a Comment