ইসবগুলের ঔষধি গুনাগুন

ইসবগুলের ঔষধি গুনাগুন
ইসবগুল ‘গুল’ জাতীয় গাছ। এর ফুল ছোট, পাপড়ি সূক্ষ হয়। বীজের খোসা আছে। বীজ দেখতে নৌকার মতো এবং এর খোসায় পিচ্ছিল হয়। এটা এক ধরনের রবিশস্য। হেমন্তকালে বীজ বপন করা হয়। চৈত্র মাসে ফসল তোলা হয়।

ইসপগুল আমাদের দেশে কনস্টিপেশনের চিকিৎসায় একটি বহুল ব্যবহৃত পণ্য। অনেকেই আমরা রোযা’র সময় শরবতের সাথেও এটি খাই। কিন্তু খুব কম লোকেই জানি এটি পাওয়া যায় কি থেকে! আসুন জানি সেই গাছের কথা যা থেকে আমরা পাই ইসপগুল। ইসপগুল গাছের বৈঙ্গানিক নাম Plantago ovata.

এটি একটি একবর্ষজীবি উদ্ভিদ। লম্বায় ১২-১৮ ইঞ্চি হয়। বীজ বপনের ২ মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসে ও ১১০-১৩০ দিনের মধ্যে ফসল তোলার উপযোগী হয়। ভারত, পাকিস্তান, ইরান, এ্যারাবিয়ান পেনিনসূলার দেশগুলিতে এর চাষ হয়।এখন কথা হচ্ছে ইসপগুলের ভুষি তাহলে ধরে কোথায়? আসলে এর পরিপক্ক বীজের সবচেয়ে বাইরের ত্বক (এপিডার্মিস) ও এর সংলগ্ন নিচের লেয়ার দুটি একসাথে আলাদা হয়ে আসে যা আমরা ইসপগুল হাস্ক বা ইসপগুলের ভুষি বলে থাকি। এর মূল উপাদান মিউসিলেজিনাস পলিস্যাকারাইড। এরা আমাদের অন্ত্র বা ইন্টেসটাইনে পানি শোষণ করে ফুলে যেয়ে পরিমাণে বৃদ্ধি পায় (নিজের ওজনের ৪০ গুণ পর্যন্ত) এবং এভাবে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

ঔষধি গুনাগুনঃ
ইসবগুল মানুষের শরীরের জন্য খুবই উপকারি। ইসবগুলের ভুষি বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
-এর মধ্যে যে অদ্রবণীয় ও দ্রবণীয় খাদ্য আঁশ থাকে তা কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য খুব ভালো।
-ডায়রিয়া ও পাকস্থলীর ইনফেকশন সারায়।
-অ্যাসিডিটির সমস্যা প্রতিকার করে।
-ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কার্যকারী।
-পাকস্থলীর বর্জ্য পদার্থ নিষ্কাশন করে ও হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে।
-এর খাদ্য আঁশ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় ও হৃদরোগ থেকে সুরক্ষিত করে।
-ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

ইসবগুলের উপকারিতাঃ

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করেঃ সবগুলের দ্রবণীয় ফাইবারের পানি শোষণের প্রকৃতির জন্যই মল নরম হতে সাহায্য করে। ইসবগুলের ভুষির অদ্রবণীয় ফাইবার মলের পরিমাণ বৃদ্ধি করে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। তাই কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ২ চামচ ইসবগুল ১ গ্লাস কুসুম গরম দুধের সাথে মিশিয়ে পান করুন প্রতিদিন ঘুমুতে যাওয়ার আগে।

ডায়রিয়া সারায়ঃ এটি বিশ্বাস করা কঠিন যে ইসবগুল একই সাথে পরিপাকের দুটি ভিন্ন ধরণের সমস্যা সমাধানে সাহায্য করে। ইসবগুলের দ্রবণীয় ফাইবার অন্ত্রের পানি শোষণ করে ফুলে উঠে এবং তরল মলকে আবদ্ধ করে শক্ত করে ফেলে। ২ চামচ ইসবগুল ৩ চামচ দইয়ের সাথে মিশিয়ে খাওয়ার পর খান দিনে দুইবার করে। দইয়ের প্রোবায়োটিক পাকস্থলীর ইনফেকশন সারাতে সাহায্য করে।

ওজন কমায়ঃ ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাঁধা হচ্ছে ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। ইসবগুল পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। অন্ত্র পরিস্কারেও সাহায্য করে ইসবগুল। ওজন হ্রাসের সময় চর্বি পোড়ানোর প্রক্রিয়ায় শরীরে অনেক বর্জ্য পদার্থ উৎপন্ন হয়। হঠাৎ করে কাঁচা খাবারের পরিমাণ বৃদ্ধি করলে তা পাকস্থলীর জন্য বেশ ভারী হয়ে যায় তাই কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেট ফাঁপার সমস্যা তৈরি করে। সুস্থতার জন্য এই বর্জ্য পদার্থগুলো শরীর থেকে বাহির হয়ে যাওয়া প্রয়োজন। ইসবগুল পাকস্থলী পরিষ্কার করতে সাহায্য করে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়ার মাধ্যমে। প্রতিদিন সকালে অথবা খাওয়ার পূর্বে কুসুম গরম পানিতে ইসবগুল ও লেবুর রস মিশিয়ে পান করলে পেট ভরার অনুভূতি হয় এবং অন্য খাবার খাওয়ার ইচ্ছা কমায়।

কোলেস্টরেলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেঃ
ইসবগুলের দ্রবণীয় ফাইবার রক্তের কোলেস্টেরল কমতে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রে ফ্যাট ও অতিরিক্ত কোলেস্টেরলের সাথে জেল গঠন করে বর্জ্যের সাথে বের হয়ে যায়। অন্ত্রের দেয়াল যাতে ফ্যাট শোষণ করতে না পারে তাতে সাহায্য করে ইসুবগুল।এছাড়াও ডায়াবেটিস, পাইলস ও ফিশারের রোগীদের জন্য উপকারী ইসবগুল। এসিডিটির সমস্যা সমাধানে এবং হজমক্রিয়ার উন্নতিতেও সাহায্য করে ইসবগুল।

সাবধানতাঃ

যেকোন খাবারই বেশি পরিমাণে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাই উপকারী ইসবগুলেরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে
-কখনো কখনো এটি পাকস্থলীতে টান সৃষ্টি করতে পারে। তাই এমন ক্ষেত্রে ইসবগুল খাওয়া বন্ধ করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
-যদি অ্যালার্জি দেখা দেয় তাহলেও দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যান।
-যদি আপনার এপেন্ডিসাইটিস ও স্টোমাক ব্লকেজের মত স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে তাহলে ইসবগুল খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
-ইসবগুল অনেকক্ষণ আগে ভিজিয়ে না রেখে সাথে সাথে ভিজিয়ে পান করুন। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো ইসবগুল যথেষ্ট পরিমাণ পানিতে ঢেলে যত দ্রুত সম্ভব পান করে নিন। এর সুফল পেতে এর সঙ্গে প্রচুর পানি পান করতে হবে।
-এটি গেলা বেশ কষ্টকর এবং যাদের অন্ত্রে সমস্যা আছে, তাদের জন্য এটি সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

বিঃদ্র: রমজানের ইফতারে ইসবগুলের শরবত বিশেষ উপকারি।

No comments:

Post a Comment